নিজস্ব প্রতিবেদক,
রায়পুরা (নরসিংদী): নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায় মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের বিরুদ্ধে সরকারি অকৃষি খাস জমি, সাধারণ কৃষকদের ব্যক্তিমালিকানাধীন ফসলি জমি জবরদখল এবং ঐতিহাসিক ‘সাহার খোলা খাল’ বালু ভরাট করে নদী ও পরিবেশ ধ্বংসের এক ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। করপোরেট শক্তির লেলিয়ে দেওয়া ক্যাডার বাহিনীর অস্ত্রের মহড়া এবং বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী নীতি-নির্ধারকদের প্রত্যক্ষ মদদে ঐতিহ্যবাহী কাঁকন নদী আজ সম্পূর্ণ বিলুপ্তির পথে। এতে করে একদিকে যেমন সহস্রাধিক একর জমিতে কৃষি সেচ ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান হারিয়ে বিপন্ন হয়ে পড়েছে শত শত জেলে পরিবার।
ইতিহাস ও ভৌগোলিক গুরুত্ব: ভৌগোলিক তথ্য অনুযায়ী, রায়পুরা শহরের পাশ দিয়ে প্রবহমান ঐতিহ্যবাহী কাঁকন নদীটি মাহমুদপুর ও চর বাখরনগর মৌজার সংমিশ্রণে রায়পুরা মৌজার ৫৭৬৪ নং দাগ এবং বাখরনগর মৌজার ৬৩৪ নং দাগে সাহারখোলা গ্রাম সংলগ্ন এলাকায় সমাপ্ত হয়েছে। পরবর্তীতে ১৯৮১ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাঁর দূরদর্শী দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচির আওতায় চর বাখরনগর মৌজার আরএস ১০, ১৮, ১৯ ও ২০ নং দাগসহ বিপুল পরিমাণ খাস জমিতে প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ ‘সাহার খোলা খাল’ খনন করেন। এই খালটি কাঁকন নদীকে সরাসরি প্রমত্তা মেঘনা নদীর সাথে সংযুক্ত করে এক অভূতপূর্ব প্রাণসঞ্চার করেছিল। এর ফলে রায়পুরার সাথে পূর্বাঞ্চল এবং ভৈরবের নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা যেমন সহজ ও সাশ্রয়ী হয়েছিল, তেমনই নদী তীরবর্তী এলাকায় নির্মিত ৩টি স্লুইসগেটের মাধ্যমে আশেপাশের হাজার হাজার একর জমিতে কৃষি সেচ কার্যক্রম নির্বিঘ্ন হতো।
শুধু কৃষি বা অর্থনৈতিক যোগাযোগই নয়, কাঁকন নদীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতো এই অঞ্চলের সংস্কৃতি ও জীবিকা। নদীর তীরবর্তী পাগলনাথ মন্দির ঘাটে প্রতি বছর হিন্দু সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী পুণ্যস্নান অনুষ্ঠিত হতো, যেখানে দেশ-বিদেশ থেকে হাজার হাজার পুণ্যার্থীর সমাগম ঘটত। এছাড়া বৈকুন্ঠপুর গ্রামের শতাধিক ধীবর (জেলে) পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস ও জীবন-জীবিকা ছিল এই কাঁকন নদী। মেঘনা গ্রুপের আগ্রাসনে নদীটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় আজ শত শত জেলে পরিবার সম্পূর্ণ কর্মহীন হয়ে পড়েছে।
লুটেরা সিন্ডিকেট ও ক্ষমতার দাপট: অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২০ সালে কাঁকন নদীর তীরবর্তী এবং তলদেশের এই খাস জমির ওপর লোলুপ দৃষ্টি পড়ে মেঘনা গ্রুপের। তারা চর বাখরনগর মৌজার ৫৮টি দাগে ১০.৩০ একর খাস জমি ইজারা (লীজ) নেওয়ার জন্য আবেদন করে। কিন্তু ইজারা অনুমোদনের তোয়াক্কা না করেই, বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত মোজাম্মেল বাবুকে মেঘনা গ্রুপের অংশীদার বানিয়ে তার ক্ষমতার দাপটে অবৈধ দখলদারিত্ব শুরু হয়। সাহারখোলা খালসহ সরকারি খাস জমি এবং পার্শ্ববর্তী নিরীহ কৃষকদের ব্যক্তিমালিকানাধীন ফসলি জমিসহ সর্বমোট ৩২.২০ একর জমিতে জোরপূর্বক ও বেআইনিভাবে মাটি ভরাট শুরু করে কোম্পানিটি।
তৎকালীন সময়ে স্থানীয় ভুক্তভোগী জমির মালিক এবং এলাকাবাসী জীবন বাজি রেখে বাধা প্রদান করেন, মানববন্ধন করেন এবং উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের নিকট স্মারকলিপি প্রদান করেন। কিন্তু প্রশাসনের তৎকালীন শীর্ষ কর্তারা এক অদৃশ্য ও অনৈতিক প্রভাবে সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করেন। এই সুযোগে মেঘনা গ্রুপ স্থানীয় কৃষকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে নামমাত্র মূল্যে তাদের পৈতৃক সম্পত্তি দলিল করে দিতে বাধ্য করে।
১৫ হাজার কোটি টাকার বালু লুট: নদী ও খাস জমি জবরদখলের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের পেছনে রয়েছে এক বিশাল আর্থিক লুটপাটের সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, ভৈরবের জান্নাত হোটেলের মিন্টু কমিশনার, রায়পুরা ইউনিয়নের ফারুক চেয়ারম্যান, মামুন মেম্বার এবং সাবেক মন্ত্রীর পিএস পারভেজ আহমেদ বাবুসহ আওয়ামী লীগের একদল প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দ এবং কথিত ৪ জন সাংবাদিক নেতা সম্মিলিতভাবে মেঘনা নদী থেকে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার বালু অবৈধভাবে উত্তোলন ও লুট করেছে। পরবর্তীতে এই লুণ্ঠিত বালু তারা সরাসরি মেঘনা গ্রুপের কাছে বিক্রি করে নদী ও খাস জমি ভরাটের কাজে সহায়তা করেছে।
অস্ত্রের মহড়া ও বর্তমান পরিস্থিতি: বর্তমানেও এই বিশাল জনগুরুত্বপূর্ণ জমি ও নদী সম্পূর্ণ জবরদখল করে রেখেছে মেঘনা গ্রুপ। জমিতে সাধারণ কৃষকদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কোম্পানির লেলিয়ে দেওয়া সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী দিনরাত সেখানে অবস্থান করছে এবং প্রতিনিয়ত অস্ত্রের মহড়া দিয়ে এলাকায় তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করে রেখেছে। পৈতৃক ভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে রায়পুরার প্রান্তিক কৃষকেরা আজ নিজ ভূমিতে পরবাসী ও চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
চোখ রাখুন আগামী পর্ব (১)