বিশেষ প্রতিবেদক
লামিয়া সরকার (বর্ষা)
বিশেষ প্রতিনিধি, সিলেট:
সিলেটের আধ্যাত্মিক রাজধানী খ্যাত হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.) মাজারের দানবাক্সের আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থানে নেমেছে জেলা প্রশাসন। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সনাতন হিসাব পদ্ধতির আড়ালে কোনো অনিয়ম হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে গত শুক্রবার মাজারের দানবাক্সগুলোতে সিলগালা ও তালাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসকের কড়া হুঁশিয়ারি
গত মঙ্গলবার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সভায় সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সারওয়ার আলম বলেন,
”আগামী এক মাস জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে ওয়াক্ফ এস্টেট ও মাজার কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করবে। এ সময়ের মধ্যে দানের উৎস, ব্যয়ের খাত ও সামগ্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার চিত্র পর্যালোচনা করা হবে।”
তিনি আরও জানান, কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর খেয়ালখুশিমতো মাজারের টাকা খরচ করতে দেওয়া হবে না। ভবিষ্যতে এখানে সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে হিসাব সংরক্ষণ এবং নিয়মিত অডিটের (নিরীক্ষা) ব্যবস্থা করা হবে।
মাজার কর্তৃপক্ষের ও খাদেমদের বক্তব্য
প্রশাসনের এই আকস্মিক পদক্ষেপে মাজার সংশ্লিষ্টদের মধ্যে কিছুটা চাঞ্চল্য তৈরি হলেও, প্রধান খাদেম ও মাজারের সাধারণ খাদেমরা প্রশাসনের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। মাজারের বর্তমান প্রধান খাদেম হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর বংশধর সামুন মাহমুদ কাইয়ুম।
প্রধান খাদেমের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মাজারের সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখতে এবং হিসাবের স্বচ্ছতার জন্য তারা প্রশাসনকে পূর্ণ সহযোগিতা করবেন। তবে কিছু সাধারণ খাদেম নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ভক্তদের দেওয়া দান যেন মাজারের উন্নয়ন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন এবং লঙ্গরখানার কাজেই সঠিকভাবে ব্যয় হয়, তা নিশ্চিত করা উচিত।
টাকা দিচ্ছে কোন কোন খাদেম?
মাজারের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট খাদেম ব্যক্তিগতভাবে মাজার পরিচালনায় টাকা দেন না। বরং দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভক্ত ও দর্শনার্থীরা যে টাকা দানবাক্সে মানত বা দান হিসেবে দেন, সেটাই মাজারের মূল তহবিল। বংশানুক্রমিকভাবে নিয়োজিত খাদেমরা এই দান সংগ্রহ ও লঙ্গরখানা তদারকি করেন। তবে এবার প্রশাসনের তদন্তে বেরিয়ে আসবে কোন কোন খাদেম বা উপদল এই অর্থের ভাগ-বাটোয়ারার সাথে যুক্ত ছিলেন।
এক নজরে হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের ইতিহাস ও তথ্য
প্রতিষ্ঠা সাল: হযরত শাহজালাল (রহ.) ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে (৭০৩ হিজরি) ইয়েমেন থেকে সিলেটে আসেন এবং রাজা গৌর গোবিন্দকে পরাজিত করে সিলেটে ইসলামের পতাকা ওড়ান। ১৩৪৬ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর ওফাতের পর এই মাজার শরিফ প্রতিষ্ঠিত হয় (প্রায় ৭০০ বছরের পুরোনো)।
প্রতিষ্ঠাতা: মূলত হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর ভক্ত, অনুসারী এবং পরবর্তী মুসলিম শাসকরা (যেমন সুলতান শামসুদ্দীন ফিরুজ শাহ-এর সময়কাল থেকে শুরু করে আলাউদ্দিন হোসেন শাহ) এই মাজারের অবকাঠামো ও পরিধি বিস্তার করেন।
জমির পরিমাণ: দরগাহ শরিফ ও এর আশপাশের ওয়াক্ফ এস্টেটের আওতাধীন মোট জমির পরিমাণ প্রায় ৮.৫ একর (তবে বিভিন্ন সময়ে বেদখল হওয়া ও লিজ দেওয়া জমি মিলিয়ে এর মোট সম্পত্তি আরও বেশি)।
কবরের সংখ্যা: প্রধান মাজার কমপ্লেক্সের ভেতরে মূল কবর বা মাজার রয়েছে ১টি— যা হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর। তবে এই মাজার প্রাঙ্গণে তাঁর প্রধান অনুসারী, ইয়েমেন থেকে আসা সঙ্গী (৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম ব্যক্তিবর্গ) এবং সিলেটের প্রখ্যাত ব্যক্তিবর্গসহ শত শত কবর রয়েছে। লঙ্গরখানার পাশে ও পেছনের টিলায় সাধারণ ভক্ত ও খাদেমদের অসংখ্য সমাধি রয়েছে যার সুনির্দিষ্ট কোনো একক সংখ্যা নেই।